গাজায় ‘গণহত্যা’ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরেও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করছে ইসরায়েল—এমন অভিযোগ করেছে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন। সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কমিশন জানিয়েছে, পশ্চিম তীরে সামরিক অভিযান ও ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ব্যাপক ও পরিকল্পিত হামলা চালানো হচ্ছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েলের দখলে থাকা পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে নিধন, নির্যাতন, ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন সহিংসতাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। জাতীয়তা, বর্ণ ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক নিপীড়নের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে এতে।
এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কমিশন বলেছিল, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের প্রাণঘাতী হামলার পর গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে। ইসরায়েল বরাবরই এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
নতুন প্রতিবেদনটি ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনের ঠিক আগের দিন প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, পশ্চিম তীরে সামরিক অভিযান এবং ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার ফলে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ব্যাপক ও সুপরিকল্পিত হামলা অব্যাহত রয়েছে।
অভিযোগ প্রত্যাখ্যান ইসরায়েলের
জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের গঠিত তিন সদস্যের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে জেনেভায় অবস্থিত ইসরায়েলি মিশন। তাদের দাবি, ইসরায়েলকে শয়তান হিসেবে উপস্থাপন এবং দেশটির অস্তিত্বকে অপরাধ হিসেবে তুলে ধরতেই কমিশন এ ধরনের প্রচারণা চালাচ্ছে।
এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি মিশন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে প্রতিবেদনটির বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করার, কমিশনের সিদ্ধান্ত মেনে না নেওয়ার এবং কমিশনটি বিলুপ্ত করার দাবি জানানোর আহ্বান জানিয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ ২০২১ সালে এই স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে। দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের সাবেক বিচারক নাভি পিল্লাই ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন। প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে প্রাণহানি এবং শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে।
পশ্চিম তীরকে বসবাসের অযোগ্য করার অভিযোগ
কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হামাসের হামলার পর পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি জনগণকে সামষ্টিকভাবে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। বিভিন্ন এলাকায় বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলার ধরনকে উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় ও সুপরিকল্পিত কার্যক্রমের ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
এতে আরও অভিযোগ করা হয়, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা সম্পর্কে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ অবগত ছিল এবং তাদের কর্মকাণ্ডে উৎসাহ জুগিয়েছে।
কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন মুরলীধর বলেন, ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা ও আহত করা, বাড়িঘর ধ্বংস এবং এসব কর্মকাণ্ডের দায় অস্বীকার করার বিষয়গুলো ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও নির্মূল করা এবং তাঁদের জীবনযাত্রাকে অসহনীয় করে তোলার বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
ভারতীয় এই বিচারক আরও বলেন, ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় মর্যাদাকে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার কার্যকর উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করছে।
প্রতিবেদনে কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনীর কিছু কর্মকাণ্ডে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা ও গুরুতর ক্ষতি করার উদ্দেশ্য ছিল বলে কমিশন মনে করে। এসব কর্মকাণ্ডকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করার মতো উপাদান রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গাজায় প্রাণহানি ও গণহত্যার অভিযোগ
ইসরায়েলি সরকারি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে এএফপির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলায় ইসরায়েলে ১ হাজার ২২১ জন নিহত হন।
এর জবাবে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে উপত্যকাটির প্রায় পুরো জনসংখ্যা বাস্তুচ্যুত হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, সেখানে ৭৪ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। মন্ত্রণালয়টি হামাস-নিয়ন্ত্রিত হলেও জাতিসংঘ এর দেওয়া প্রাণহানির পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তে পর্যালোচনা করা ঘটনাগুলো গাজার ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও বাহিনীর গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দেয়।
গাজায় গণহত্যা বন্ধ এবং গণহত্যা ও এতে উসকানি প্রতিরোধে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তদন্ত কমিশন।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও সমালোচনা
প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম নিয়েও সমালোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়, কর্তৃপক্ষটি গ্রহণযোগ্যতা ও বৈধতার সংকটে রয়েছে এবং ভিন্ন রাজনৈতিক মত প্রকাশকারীদের লক্ষ্যবস্তু করছে। এর ফলে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দ্রুত, কার্যকর ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে কমিশন।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সোমবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রতিবেদনটি উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর