জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে রোববার (২৫ অক্টোবর) রাতে টোকিওর উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি দেশটির শীর্ষ বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি ও উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করবেন তিনি।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ানো এবং দুই দেশের উন্নয়ন অংশীদারত্ব আরও জোরদার করাই এ সফরের প্রধান লক্ষ্য। সফরসূচিতে রয়েছে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন এবং জাপানের ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি
পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, আগামী ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির আনুষ্ঠানিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠক শেষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে বিশেষ মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী।
সফরে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও গভীর করার বিষয়ে আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আলোচ্যসূচিতে গুরুত্ব পাবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়ন, জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়।
এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ প্রশিক্ষণ নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
পররাষ্ট্রসচিবের তথ্য অনুযায়ী, কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বেসামরিক বিমান চলাচল, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় সরকারব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। বর্তমানে আটটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে তিন থেকে চারটি সফরকালে চূড়ান্ত করে স্বাক্ষর করা হতে পারে।
ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন
সফরে ‘জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরাম’-এ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ছাড়া জাপানের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন তিনি। ‘জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ’ এবং ‘জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন’-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও পৃথক বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি), জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের অংশ হিসেবে চিবা প্রিফেকচারের ফুত্তসু শহরে অবস্থিত এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘুরে দেখবেন তারেক রহমান। এ ছাড়া নাগোয়ায় পোশাক ব্র্যান্ড ইউনিক্লোর সদর দপ্তর এবং টয়োটার কারখানা পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
১৩.৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত সময়ের জন্য ১২টি অগ্রাধিকার খাতে প্রায় ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্যাকেজের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বিনিয়োগের বড় একটি অংশ বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (বিআইজি-বি) উদ্যোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রস্তাবিত প্যাকেজে পরিবহন ও নগর সংযোগ খাতে ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, মাতারবাড়ী সমন্বিত শিল্প ও বন্দরকেন্দ্রে ৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার, উৎপাদনশিল্প ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে ১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার এবং জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব রূপান্তরে ১ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৯৪০ মিলিয়ন ডলার।
এ ছাড়া কৃষি, ওষুধশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্লু ইকোনমি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের জন্য আরও ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব রয়েছে।
সফরসঙ্গীদের তালিকায় মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও কর্মকর্তারা
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে থাকছেন তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান। প্রতিনিধি দলে রয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
এ ছাড়া ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী প্রতিনিধি দলে রয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে থাকছেন অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, একান্ত সচিব-২ মো. মেহেদুল ইসলাম, একান্ত সচিব-১ মিয়া মোহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদী, সহকারী সামরিক সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জুননুন নাহিদ, প্রটোকল অফিসার-২ কামরুল ইসলাম, গবেষণা কর্মকর্তা মো. আবদুস সাত্তার পাটোয়ারী, সহকারী ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ এন এম মনোয়ারুল কাদির, এডিসি স্কোয়াড্রন লিডার সৈয়দ নাজমুল হোসেন, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো. নওয়াব আলী এবং ফাতেমা বেগম।
প্রেস বিভাগের প্রতিনিধি হিসেবে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব শাহাদাত হোসেন স্বাধীন ও সিনিয়র ফটোগ্রাফার মো. খালেদ ইবনে এম এ রব।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দলে রয়েছেন পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম, সচিব সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী, অতিরিক্ত সচিব এস এম আনিসুল হক, চিফ অব প্রটোকল এ এফ এম জাহিদ-উল-ইসলাম, উপপ্রধান প্রটোকল মো. বেলাল হোসেন, পরিচালক রুহুল আমিন ও মো. ইফতেখার রহমান এবং সিনিয়র সহকারী সচিব মো. সাহাব উদ্দিন।
প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় সফরসঙ্গী হচ্ছেন স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুস সামাদ চৌধুরী, প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলাম আরিকুল আলম, এসএসএফের উপপরিচালক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোহাম্মদ ফারহান ওয়াসিফ, সহকারী পরিচালক ক্যাপ্টেন মো. মেহরাজ ইসলাম, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ফওজিয়া আলম ও লেফটেন্যান্ট তাসফিয়া আক্তার। এ ছাড়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মঈনুল হোসেনও প্রতিনিধি দলে রয়েছেন।
সফরসঙ্গীদের তালিকায় আরও রয়েছেন মো. আজিজুল হক ইসলামাবাদী ও মো. তারেক রহমান।
আজ জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, সফর সঙ্গী হচ্ছেন যারা