দীর্ঘ আট মাসের খাঁ খাঁ নীরবতা ভেঙে অবশেষে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি কেটে প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের পথে যাত্রা শুরু করেছে পর্যটকবাহী জাহাজ। নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর পেরিয়ে পর্যটকদের পদচারণায় ফের মুখরিত হতে যাচ্ছে স্বপ্নের এই দ্বীপ।
আজ বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে ৮৩৬ জন পর্যটক নিয়ে ‘এমভি বারো আউলিয়া’ নামের একটি জাহাজ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করার মধ্য দিয়ে বহুল প্রতীক্ষিত এই নৌপথ সচল হয়েছে।
জাহাজ চলাচল শুরু ও স্কোয়াবের বক্তব্যজাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জাহাজ চলাচল শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পর্যটকের সংখ্যা বিবেচনায় না নিয়ে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেই আজ সকাল থেকে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে পর্যটকদের দীর্ঘ আট মাসের অপেক্ষার অবসান ঘটেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য সেন্টমার্টিন দ্বীপ ভ্রমণের সুযোগ চালু হলেও বিভিন্ন প্রশাসনিক ও অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতায় এতদিন জাহাজ চলাচল শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে নৌপরিবহন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর অনুমোদন এবং কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সম্মতি পাওয়ায় জাহাজ চলাচলের পথ সুগম হয়।
যাত্রী ধারণক্ষমতা ও সময়সূচিঅনুমোদন পাওয়া তিনটি জাহাজ কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে পর্যটক নিয়ে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। এই জাহাজগুলোর সম্মিলিত যাত্রী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯৮ জন। এর মধ্যে—
- ৮৫০ জন যাত্রী।এমভি বারো আউলিয়া:
- ৭৩২ জন যাত্রী।এমভি কর্ণফুলি:
- ৭১৬ জন যাত্রী।এমভি টেকনাফ:
নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, প্রতিদিন এমভি বারো আউলিয়া সকাল ৭টায় কক্সবাজার থেকে যাত্রা শুরু করে সেন্টমার্টিন থেকে বেলা আড়াইটায় ফিরবে। এমভি কর্ণফুলি সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে গিয়ে দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে ফিরবে। অন্যদিকে, এমভি টেকনাফ সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে যাত্রা শুরু করে দ্বীপ থেকে বিকেল সাড়ে ৩টায় কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দেবে।
ভ্রমণের নিয়ম ও পরিবেশ সংরক্ষণে বিধিনিষেধসরকারের সংশোধিত নির্দেশনা অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর থেকে আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকেরা সেন্টমার্টিনে যাতায়াত ও রাত্রিযাপন করতে পারবেন। তবে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার অনুমতি পাবেন। প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে এবং ভ্রমণের জন্য ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকিট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কিছু কড়া বিধিনিষেধ বহাল রাখা হয়েছে:
- উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টির আয়োজন নিষিদ্ধ।রাতে সমুদ্রসৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো,
- কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।কেয়াবনে প্রবেশ,
- সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালসহ কোনো ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি করা যাবে না। রাজকাঁকড়া, তারামাছ, ঝিনুক, শামুক, প্রবাল, পাখি,সামুদ্রিক কাছিম,
- সি-বাইকসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ রয়েছে।সৈকতে মোটরসাইকেল,
ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্যদীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় সেন্টমার্টিন ভ্রমণে আগ্রহীদের মধ্যে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। ঢাকা থেকে বড় একটি দল নিয়ে সেন্টমার্টিনগামী পর্যটক হোসাইন জামিল জানান, সাগরের নীল জলরাশি ও রাতে প্রবাল দ্বীপে অবস্থানের বিষয়টি তার কাছে অত্যন্ত রোমাঞ্চকর মনে হচ্ছে।
এদিকে সেন্টমার্টিনের আবাসিক হোটেল ব্যবসায়ী আবদুর রহিম জিহাদী জানান, দ্বীপে দেড় শতাধিক আবাসিক হোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে এবং পর্যটকদের বরণ করতে পুরো দ্বীপের বাসিন্দারা মুখিয়ে আছেন।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান জানান, যারা নিয়ম মেনে টিকিট পেয়েছেন, তাদের নিয়ে ‘এমভি বারো আউলিয়া’ জাহাজটি সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। একজন প্রশাসনিক কর্তা ও চারজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সবকিছু দেখভাল করছে। তিনি সবাইকে নিয়মের ভেতর থেকে সেন্টমার্টিন ভ্রমণের আহ্বান জানিয়েছেন।
মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন প্রধানমন্ত্রী