দেশের রপ্তানি খাতের প্রাণস্পন্দন পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ, বিক্ষোভ ও সহিংসতার প্রেক্ষাপটে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। যে কোনো মূল্যে পোশাক কারখানা চালু রাখা এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে আগামী ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টা করা হলে তা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
গতকাল সন্ধ্যায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের জরুরি বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশনা দেন। ঘণ্টাব্যাপী চলা এই বৈঠক শেষে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের এ বিষয়ে বিস্তারিত জানান।
উচ্চপর্যায়ের জরুরি বৈঠক
সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর শ্রম উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন এবং জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এমপি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
কারখানা চালু ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতের নির্দেশ
বৈঠক শেষে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান যাতে সঠিকভাবে চলে এবং জনগণের জানমাল যেন নিরাপদ থাকে, সে জন্য প্রধানমন্ত্রী সবাইকে সজাগ থাকতে বলেছেন। এ ব্যাপারে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে পোশাকশিল্পে চলমান বিশৃঙ্খলা ও কারখানা ভাঙচুরের কারণে মালিকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৫২৯টি কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানান, সহিংসতা বন্ধ না হলে মালিকরা কারখানা চালু রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। তবে সরকার কারখানাগুলোর পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে উৎপাদন সচল রাখার জন্য মালিকদের আশ্বস্ত করেছে।
‘সীমান্তের ওপারের ইন্ধনে অস্থিরতা’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতার পেছনে ‘সীমান্তের ওপার থেকে ইন্ধন’ জোগানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “নিরীহ গার্মেন্টশ্রমিকদের ব্যবহার করে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য ও উৎপাদন ব্যাহত করার ষড়যন্ত্র চলছে। সরকার এ ধরনের অপতৎপরতা কঠোর হাতে মোকাবিলা করবে।”
তিনি আরও জানান, “আমরা লক্ষ করেছি, আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক মুখোশধারী ঢুকে নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করছে। আমাদের কাছে যেসব তথ্য আছে, তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। যারা সহিংসতার সঙ্গে জড়িত, তাদের ইতিমধ্যে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।”
শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন
উল্লেখ্য, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে গতকাল সকাল থেকেই ঢাকার মিরপুর, গাজীপুর, আশুলিয়া ও সাভারে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল দুপুরের আগেই সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, এসব সহিংস আন্দোলনের সঙ্গে কোনো প্রকৃত শ্রমিক ভাই জড়িত নন। তারা আলাপ-আলোচনা করবেন। তাদের প্রতিনিধির নাম দেওয়া হয়েছে এবং মজুরি বোর্ড গঠিত হয়েছে। সেই বোর্ডের মাধ্যমেই তাদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ হবে।” তিনি শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনার কথাও উল্লেখ করেন।
মালিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান
সরকারের পক্ষ থেকে গার্মেন্টস মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, তারা যেন শঙ্কিত না হয়ে সব কারখানা ও উৎপাদন চালু রাখেন। সাময়িক ভয়ের কারণে যে কারখানাগুলো বন্ধ হয়েছে, সেগুলো দ্রুত খোলার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—যারাই সহিংসতা, ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সীমান্তের ওপারের ইন্ধনে পোশাক শিল্পে অস্থিরতা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী