তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ/তৌসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের মাত্র নয় দিন আগে ডিবির এক অভিযানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গিয়েছিলেন তাঁর আপন বোন কে এম সাওয়াফা সিলভি (২৬)।
পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) আব্দুল্লাহ আল জহিরের ভাড়া দেওয়া একটি বাড়িতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানে আটক ৮৫ জনের তালিকায় প্রথম নামটি সাওয়াফার। কোনো ধরনের ডোপ টেস্ট বা রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়াই গভীর রাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাঁকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।
এদিকে ব্যক্তিগত বাসভবনের অপব্যবহারের সুযোগ দেওয়া ও বিভাগীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁকে রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় অবস্থিত পুলিশ স্পেশাল ট্রেনিং স্কুলে (পিএসটিএস) সংযুক্ত করার আদেশ জারি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৯ অক্টোবর রাতে ভাটারা এলাকার ওই বাসা থেকে সাওয়াফা সিলভিকে আটক করা হয়। এর আট দিন পর, ২৭ অক্টোবর রাজধানীর উত্তরা থেকে নিখোঁজ হন তাঁর বড় ভাই সাবেক বৈমানিক তাহসিফ সাউরি। পরদিন ২৮ অক্টোবর তুরাগ নদ থেকে তাঁর ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। মেয়ে ডিবির অভিযানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা অবস্থায় নিখোঁজ ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় পরিবারটি। তাদের বাড়ি উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে। বাবা কে এম এনায়েতুর করিম হেলাল।
একই অভিযানে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৫৯ জন পুরুষের মধ্যে ছিলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় রক ব্যান্ড ‘ওয়ারফেজ’-এর ড্রামার ও দলনেতা শেখ মনিরুল আলম টিপুর ছেলে। তিনি পেশাদার বাদ্যযন্ত্রশিল্পী হিসেবে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ওই রাতের অনুষ্ঠানে ড্রামস বাজাতে গিয়েছিলেন। মাদক সেবনের কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাঁকেও এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
কী ঘটেছিল অতিরিক্ত ডিআইজি জহিরের বাসায়?
গত ১৯ অক্টোবর দিবাগত রাতে ভাটারা থানার পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১ আবাসিক এলাকার ‘গোল্ডেন সানরাইজ’ নামের তিনতলা ভবনে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। বাড়িটির মূল মালিক অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির। পুলিশ এটিকে ‘ডিজে পার্টি ও মাদকবিরোধী অভিযান’ দাবি করে বাদ্যযন্ত্রশিল্পী, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পেশাজীবীসহ মোট ৮৫ জনকে আটক করে।
চিকিৎসা ও আইন বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, মাদক সেবনের অভিযোগ প্রমাণে রক্ত বা প্রস্রাবের ডোপ টেস্ট করা আইনত বাধ্যতামূলক। তবে আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ওই রাতেই দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। সংক্ষিপ্ত বিচারে আটক ২৬ নারীকে ১৫ দিন করে এবং ৫৯ পুরুষকে এক মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এমনকি অভিযানের সময় বাসার সিসিটিভি ক্যামেরা ও মেমোরি কার্ড খুলে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে ডিবির বিরুদ্ধে।
৮৫ জনের বিপরীতে নামমাত্র মাদক উদ্ধার
৮৫ জন তরুণ-তরুণীকে আটকের বিপরীতে পুলিশের তৈরি জব্দ তালিকায় যে পরিমাণ মাদক দেখানো হয়েছে, তা নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন উঠেছে। তালিকায় উল্লেখ করা আলামতগুলো হলো—
১. আইকনিক হোয়াইট হুইস্কি (ICONIQ WHITE WHISKY): এক লিটারের অক্ষত বোতল একটি।
২. রয়্যাল স্ট্যাগ (ROYAL STAG): এক লিটারের বোতলে আনুমানিক ৫০০ মিলিলিটার।
৩. স্মিরনফ ভদকা (SMIRNOFF VODKA): এক লিটারের বোতলে আনুমানিক ২০০ মিলিলিটার।
৪. কেরুজ ইম্পেরিয়াল হুইস্কি (CAREW'S IMPERIAL WHISKY): ৭৫০ মিলিলিটারের খালি বোতল একটি।
৫. ইয়াবা: একটি ও সেবনের সরঞ্জাম।
৬. কুশ: এক চিলতে পরিমাণ।
নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ, জামিনে মুক্তি
ব্যক্তিগত পরিসরে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার দায়ে ডোপ টেস্ট ছাড়াই ঢালাওভাবে সাজা দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে দেশের ১০১ জন বিশিষ্ট নাগরিক যৌথ বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে তাঁরা পুরো অভিযান ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে আটক ব্যক্তিদের অবিলম্বে মুক্তি এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন। ইতিমধ্যে সাওয়াফা সিলভিসহ বেশ কয়েকজন তরুণী আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
তথ্যসূত্র: দৈনিক আমাদের দিন
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক মিল্টন, সদস্যসচিব জাহাঙ্গীর