শীতের মৌসুম শুরু হলেও দেশের জনস্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডেঙ্গু ও হামের প্রকোপ। বছরের শেষ প্রান্তে এসেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না এই দুই রোগের সংক্রমণ। প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল এবং বাড়ছে আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৪৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯০৬ জন। অন্যদিকে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ২৭৬ জন।
ডেঙ্গুর পরিস্থিতি ও বিভাগভিত্তিক চিত্র:স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৩৫ জন। মৃত তিনজনের মধ্যে দুজন ঢাকা বিভাগ ও একজন খুলনা বিভাগের বাসিন্দা।
নতুন রোগী ভর্তির ক্ষেত্রেও শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ; গত একদিনেই এই বিভাগে ৭২১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ২৭৫, খুলনায় ১৬১, বরিশালে ১৪৩, রাজশাহীতে ১০৪, ময়মনসিংহে ৮৮ এবং রংপুরে ৪৩ জন ভর্তি হলেও সিলেট বিভাগে নতুন কোনো রোগী ভর্তির খবর পাওয়া যায়নি।
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৪৫৫ জনের মধ্যে ঢাকা বিভাগেই (ঢাকা মহানগরসহ) প্রাণ হারিয়েছেন ২১৭ জন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেক। এছাড়া খুলনায় ৮৪, চট্টগ্রামে ৪৬, ময়মনসিংহে ৩৭, বরিশালে ৩০, রাজশাহীতে ২৯, রংপুরে আট এবং সিলেটে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫ হাজার ৭৭৩ জন রোগী।
হামের ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ ও মৃত্যু:ডেঙ্গুর পাশাপাশি হামের পরিস্থিতিও অত্যন্ত উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ১৭১ জন এবং নিশ্চিত হামে ১০৫ জনসহ মোট ১ হাজার ২৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু গত একদিনেই হামের উপসর্গ নিয়ে চারজন মারা গেছেন, যাদের সবাই ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা।
একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ২৩৯ জনের শরীরে হামের উপসর্গ এবং ৭৫ জন নিশ্চিত হামে আক্রান্তসহ মোট ১ হাজার ৩১৪ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর ফলে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা বেড়ে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭১৪ জনে এবং নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ২৪ হাজার ২৯৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন হাসপাতালে হাম সন্দেহে ভর্তি হওয়া ২ লাখ ১০ হাজার ৯৮২ জন রোগীর মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২ লাখ ২ হাজার ৩৯৪ জন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত:জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রার ওঠানামা ও অনিয়মিত বৃষ্টির কারণে এডিস মশার প্রজনন দীর্ঘায়িত হওয়ায় শীতকালেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ কমছে না। একে মৌসুমি সমস্যা হিসেবে না দেখে সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল উল্লেখ করেছেন যে, হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ হওয়া সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক শিশুর আক্রান্ত হওয়া টিকাদান কার্যক্রমের ঘাটতি ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতাই ফুটিয়ে তুলেছে। বাদপড়া শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা এবং অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের চিকিৎসায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর রোগ প্রতিরোধ, নজরদারি, টিকাদান এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা না গেলে বছরের শেষ দিন পর্যন্ত এই দুই রোগের প্রকোপ জনস্বাস্থ্যের বড় উদ্বেগের কারণ হয়েই থাকবে।
সীমান্তের ওপার থেকেও ষড়যন্ত্র হচ্ছে দেশের বিরুদ্ধে: তারেক রহমান