মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যায় বিশ্বে শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে সৌদি আরব। দেশটিতে গত তিন বছরে বিভিন্ন অপরাধে ৮৬৪ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। সম্প্রতি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ্যে আসার পর সৌদি আরবে এই শাস্তি প্রয়োগের ব্যাপকতা আবারও আলোচনায় এসেছে।
ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের (ইএসওএইচআর) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই সৌদি আরবে ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুসারে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যায় বিশ্বে প্রথম অবস্থানে চীন, দ্বিতীয় ইরান এবং তৃতীয় সৌদি আরব।
ইএসওএইচআরের হিসাব বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবে ১ হাজার ৫৮৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশটিতে বিভিন্ন অপরাধে ১৭২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪৫-এ। সে বছর গড়ে প্রায় ২৫ ঘণ্টা পরপর একজনের শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল।
বার্ষিক হিসাবেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ২০২৫ সালে সৌদি আরবে ৩৪৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়, যা এক বছরে দেশটির সর্বোচ্চ সংখ্যা। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিন বছরে দণ্ড কার্যকর হওয়া ৮৬৪ জনের মধ্যে ৩৬৩ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক। মোট সংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ বিদেশি হওয়ায় বিষয়টি বিশেষভাবে নজরে এসেছে। তাঁদের মধ্যে অন্তত ১১ জন বাংলাদেশি ছিলেন।
ইএসওএইচআরের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বিদেশিদের বড় অংশ এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, মিসর, আফগানিস্তান, জর্ডান, নাইজেরিয়া, সিরিয়া, ইরান, সুদান, ভারত ও বাংলাদেশের নাগরিকেরা।
বিদেশিদের মৃত্যুদণ্ডের চিত্র
ইএসওএইচআরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে সৌদি আরবে আট বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল। একই বছর দণ্ড কার্যকর হওয়া বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ছিল ৩৮।
২০২৪ সালে একজন বাংলাদেশিসহ ১৩৮ বিদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি কর্তৃপক্ষ। ওই বছর বিদেশিদের বড় একটি অংশকে মাদক-সম্পর্কিত অপরাধ ও হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে, বিদেশি নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮৮-তে। দেশটিতে ওই বছর কার্যকর হওয়া মোট মৃত্যুদণ্ডের প্রায় ৫২ শতাংশই ছিল বিদেশিদের। তবে এই ১৮৮ জনের মধ্যে কোনো বাংলাদেশি ছিলেন কি না, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
২০২৫ সালে বিদেশিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে মাদক চোরাচালান ও মাদক-সম্পর্কিত অপরাধ ছিল উল্লেখযোগ্য কারণ। এসব অপরাধে ওই বছর মোট ২৪০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যানেও বিদেশিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উচ্চ হার দেখা যাচ্ছে। ইএসওএইচআরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সৌদি আরবে ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৪৯ জন সৌদি নাগরিক, আর বাকি ৫৯ জন বিদেশি। অর্থাৎ, মোট দণ্ড কার্যকরের প্রায় ৫৪ শতাংশই ছিল বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিদেশিদের অংশ এই পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এই ৫৯ বিদেশির মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিকও রয়েছেন বলে জানিয়েছে ইএসওএইচআর। তবে বাংলাদেশির সংখ্যা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। একই সময়ে দণ্ড কার্যকর হওয়া বিদেশিদের তালিকায় আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইথিওপিয়া, সুদান, ইয়েমেন, সিরিয়া, জর্ডান, সোমালিয়া, মিসর, নাইজেরিয়া, বেনিন, ইরাক, কুয়েত, কেনিয়া ও উগান্ডার নাগরিকদের নাম রয়েছে। কোন দেশের কতজন নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তা অবশ্য প্রকাশ করা হয়নি।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরবে কার্যকর হওয়া ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৭১টি ছিল মাদক-সংক্রান্ত অভিযোগে। হত্যার দায়ে ২৫ জনের, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কারণে নয়জনের এবং অন্যান্য অপরাধে আরও তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড ঘিরে আলোচনা
গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানায়। তাঁদের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হলেও ঠিক কী অপরাধে তাঁদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। জুনের পর এই দুই বাংলাদেশি, নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তালিকায় যুক্ত হন।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানায়নি বলে জানিয়েছে জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট। এ ঘটনায় সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এবং বিস্তারিত তথ্য চেয়ে কূটনৈতিক চিঠি পাঠানো হয়েছে।
কোন অপরাধে মৃত্যুদণ্ড হয় সৌদিতে
সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক বিধান, লিখিত আইন ও রাজকীয় আদেশের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। অপরাধের ধরন, প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান বিবেচনা করে শাস্তি নির্ধারণ করা হয়।
দেশটিতে মাদক আমদানি ও বিতরণের মতো গুরুতর মাদক-সংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে মাদক-সম্পর্কিত সব অপরাধের জন্য একই শাস্তি প্রযোজ্য নয়। অপরাধের প্রকৃতি ও আইনি বিধান অনুযায়ী কারাদণ্ড, জরিমানা কিংবা আরও কঠোর শাস্তি হতে পারে।
ইচ্ছাকৃত হত্যার ঘটনায় কিসাসের বিধান অনুসারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট আইনি শর্ত পূরণ হলে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা ক্ষমা করতে পারেন অথবা ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করতে পারেন। এ ধরনের ক্ষেত্রে মামলার পরিণতিতে পরিবর্তন আসার সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া সন্ত্রাসবাদ, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা এবং গুরুতর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগেও মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য মৃত্যুদণ্ড প্রয়োজনীয় শাস্তি।
মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ নিয়ে মানবাধিকার উদ্বেগ
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপক প্রয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। বিশেষ করে মাদক-সম্পর্কিত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মনে করে, মাদক-সম্পর্কিত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। সংস্থাটি সব ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রেই মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে।
এদিকে, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর গত শনিবার আরও একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, হাসান আল ফারাজ নামের ওই ব্যক্তিকে কৈশোরে সংঘটিত একটি অপরাধের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
ইএসওএইচআরের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে কার্যকর হওয়া ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৮৩টি এমন অপরাধের জন্য দেওয়া হয়েছিল, যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে হত্যার অভিযোগ ছিল না।
মৃত্যুদণ্ডের এসব ঘটনা ছাড়াও সৌদি আরবের বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে মানবাধিকার সংস্থাটি। আসামিরা যথাযথ আইনি সহায়তা পাচ্ছেন কি না এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে এসব সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে।
আজ জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, সফর সঙ্গী হচ্ছেন যারা