সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর ১২ জনের মধ্যে সাতজনের মরদেহ দেশে ফিরেছে। বাকি পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ আগামীকাল শনিবার (৩১ অক্টোবর) দেশে আসার কথা রয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বাংলাদেশ দূতাবাস, রিয়াদের কাউন্সিলর মুহাম্মদ রেজায়ে রাব্বির স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
এদিকে প্রিয়জনের নিথর দেহ ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন বাকি পাঁচজনের স্বজনেরা। কেউ সন্তান হারিয়ে বুকভরা শোক নিয়ে ছুটছেন প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে, কেউ মুঠোফোনে সন্তানের ছবি দেখে অশ্রু ঝরাচ্ছেন। স্বজন হারানোর শোকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদেশে যেতে নেওয়া ঋণের বোঝা। সব মিলিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে পরিবারগুলোর। তার ওপর ঋণের চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তাঁরা।
নিহত ছেলে মজিদুল সরদারের মরদেহের অপেক্ষায় আছেন আত্রাই উপজেলার ৭০ বছর বয়সী মজনু সরদার ও তাঁর স্ত্রী ছাইদা বেগম। প্রিয় সন্তানের মুখ শেষবারের মতো দেখার আশায় মরদেহ ফেরার খোঁজ নিতে সপ্তাহে দুই দিন ছুটে আসেন আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে। তাঁদের একটাই প্রশ্ন—কবে দেশে ফিরবে ছেলে মজিদুলের মরদেহ?
একই অপেক্ষায় আছেন আত্রাই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের পারুল আক্তার। সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ছেলে মিনহাজের ছবি মুঠোফোনে দেখলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বুকের ধনকে হারানোর শোক কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না এই মা। কবে ছেলের মরদেহ ফিরবে, সেই চিন্তায় রাতের ঘুমও হারাম হয়েছে তাঁর।
শুধু এই দুই পরিবার নয়, একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন বাকি নিহতদের স্বজনেরাও। একদিকে প্রিয়জনকে হারানোর অসহনীয় শোক, অন্যদিকে মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষা। এর সঙ্গে রয়েছে বিদেশযাত্রার জন্য নেওয়া ঋণের চাপ। সব মিলিয়ে দিশেহারা পরিবারগুলো। স্বজনদের দাবি, দ্রুত মরদেহগুলো দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিক সরকার।
আত্রাই উপজেলার সাধনগর গ্রামের নিহত সাগর আলীর স্ত্রী পারভীন খাতুন জানান, ছয় মাস আগে সাড়ে ছয় লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তাঁর স্বামী। এখন পর্যন্ত ঋণের এক লাখ টাকাও পরিশোধ করতে পারেননি। এর সঙ্গে বন্ধক রেখেছেন মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই বসতবাড়িও। স্বামীকে হারিয়ে এখন দিশেহারা এই গৃহবধূ। তাঁদের ঘরে রয়েছে দুটি ছোট ছেলে। স্বামীর মৃত্যুতে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাদের ভবিষ্যৎ। সামনের দিনগুলোতে কীভাবে সংসার চলবে, কীভাবেই বা ঋণ শোধ করবেন—সেই চিন্তায় দিশেহারা পারভীন। তাঁর দাবি, যেকোনো মূল্যে নিহত স্বামীর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষার কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। মরদেহগুলো দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। তবে সম্প্রতি সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের ফ্লাইট-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে মরদেহ ফিরিয়ে আনতে সময় লাগছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন।
এর আগে গত ২৮ আগস্ট ১২ জনের মধ্যে সাতজনের মরদেহ দেশে ফেরে। বাকি পাঁচজনের মধ্যে চারজনের বাড়ি আত্রাই উপজেলায় এবং একজনের বাড়ি নওগাঁ সদর উপজেলায়।
প্রসঙ্গত, গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের স্থানীয় সময় দুপুর ২টার দিকে রিয়াদের শিফা থানা এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নওগাঁর ১২ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ১১ জন আত্রাই উপজেলার এবং একজন নওগাঁ সদর উপজেলার বাসিন্দা। ঘটনার প্রায় ২০ দিন পর, গত ২৮ আগস্ট আত্রাইয়ের ১১ জনের মধ্যে সাতজনের মরদেহ দেশে আনা হয়। বাকি চারজনের এবং নওগাঁ সদর উপজেলার একজনের মরদেহ এখনো সৌদি আরবে রয়েছে।
‘কিছু লোক ধাওয়া করলে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেয়, আর আমি পালিয়ে আসি’