দেশের ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে মন্তব্য করে জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেছেন, অর্থনীতি এবার শুধু লাইনচ্যুতই হবে না, নদীতে গিয়েও পড়তে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মিলনায়তনে দুই দিনব্যাপী বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের শেষ দিনের প্রথম অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘অধিকাংশ ব্যাংক আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। আমাদের ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত দুর্বল ও ভঙ্গুর। এটি প্রায় বিলুপ্তির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ ও অর্থনীতির জন্য এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি।’
বাংলাদেশ একটি ‘শোষণমূলক’ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এই শোষণ কার জন্য? সাধারণ জনগণের জন্য নয়। এই শোষণ স্বল্পসংখ্যক ধনী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা কোটিপতির জন্য, যাদের আমরা অলিগার্ক বলি। এ দেশে এই অলিগার্কদের জন্ম দিয়েছে খোদ রাষ্ট্রই।
‘অলিগার্কদের প্রশ্রয় না দিলে অর্থনীতিকে সঠিক পথে ফেরানো যাবে না—এমন ধারণাকে উৎসাহিত করা উচিত নয়। এবার অর্থনীতি লাইনচ্যুত হয়েছে, ভবিষ্যতে শুধু লাইনচ্যুত হবে না, হয়তো নদীতে গিয়ে পড়বে। তাই এ ধরনের মানুষদের বিষয়ে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকা উচিত।’
ব্যাংক খাত ক্রমেই সরকারমুখী হয়ে পড়ছে মন্তব্য করে মাহবুব উল্লাহ বলেন, বেসরকারি খাতের দিকে ব্যাংকগুলোর মনোযোগ নেই। ফলে বেসরকারি খাত ঋণবঞ্চিত হচ্ছে এবং সরকারের ঘাড়ে ঋণের বিশাল বোঝা জমা হবে।
‘সরকার কীভাবে সেই ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করবে, তা আমার জানা নেই,’ বলেন তিনি।
ব্যাংক খাতের দুরবস্থা কিংবা খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি অর্থনীতির বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় বলে মনে করেন মাহবুব উল্লাহ।
তিনি বলেন, ‘এটি সামগ্রিক রোগ বা ব্যবস্থার একেকটি উপসর্গ বা সিনড্রোম মাত্র। বাংলাদেশের ব্যাংক খাত, প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাও একই সঙ্গে সর্বগ্রাসী সংকটে আক্রান্ত।’
সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক বরকত-এ-খোদা বলেন, ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে এক ধরনের ‘বিপরীতমুখী চাপ’ বিরাজ করছে। একদিকে কিছু দুর্বল ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক তীব্র তারল্যসংকটে ভুগছে, অন্যদিকে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল সুশাসন, নমনীয় নীতিমালা এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতিকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির জন্য দায়ী বলে মনে করেন তিনি।
ব্যাংকিং সম্মেলনে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, ব্যাংকে অনিয়ম ঘটার পর নীতিমালা তৈরি করা হবে, নাকি আগেই তা করা হবে, সেটি এখন প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। তবে সবচেয়ে জরুরি হলো নীতিমালার বাস্তবায়ন।
তিনি বলেন, ‘কেউ কমপ্লায়েন্স করল কি না, তা যাচাইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ করার সময় হয়েছে।’
ব্যাংক খাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে এক অধিবেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদ ওসমান ইমাম বলেন, বিশেষ করে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল অর্থ লুটপাটের ঘটনা কীভাবে ঘটল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি।
তিনি বলেন, ‘ব্যাংক খাত থেকে, বিশেষ করে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো থেকে এত লুটপাট হলো, এত টাকা চলে গেল—তা কেউ কি জানল না? নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ কেন আগে জানল না? জেনে থাকলে তা ঠেকানো গেল না কেন? এসব বিষয়ে এখন আলোচনা হওয়া দরকার।’
বিআইবিএমের মহাপরিচালক এজাজুল ইসলাম বলেন, গত জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, সুশাসনের ঘাটতি, মূলধনের সংকট, ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সংস্থান বা প্রভিশনিংয়ের অপর্যাপ্ততা, অর্থ পাচার এবং উৎপাদনশীলতার সীমাবদ্ধতা ব্যাংকিং খাতকে দুর্বল করে তুলছে।
কিছু ব্যাংক তারল্যসংকটে ভুগলেও সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতে পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে বলে মনে করেন এজাজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আস্থা পুনর্গঠন এবং তহবিলকে কার্যকর বিনিয়োগের দিকে পরিচালিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
দেশের ব্যাংক খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, অর্থনীতি নদীতে পড়তে পারে: মাহবুব উল্লাহ