বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর নিষিদ্ধঘোষিত দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে অন্যায্যভাবে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW)। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এই দমনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
আজ বুধবার (৪ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটির নিউইয়র্ক কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই দাবি করা হয়।
বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, কারও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে তাকে শাস্তি দেওয়া বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া (Due Process) অনুসরণ না করে ব্যবস্থা নেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এতে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংগঠন করার মৌলিক অধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক মতামত ও মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণে বিগত স্বৈরাচারী সরকারগুলোর দমনমূলক নীতিরই পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
‘শুধু স্বৈরশাসকেরাই আলোচনা-বিতর্ককে ভয় পায়’
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, “বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক আলোচনা ও খোলামেলা বিতর্কের ঐতিহ্যবাহী চর্চা রয়েছে। শুধু স্বৈরশাসকেরাই এ ধরনের আলোচনা ও মতভিন্নতাকে ভয় পায়। ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গঠিত কোনো নতুন সরকারের এমন স্বাধীন চর্চাকে ভয় পাওয়ার কথা নয়।”
তিনি আরও বলেন, “অতীতের দমন-পীড়নের অন্ধকার অধ্যায় পেছনে ফেলে বাংলাদেশের এখন সামনে এগিয়ে যাওয়া দরকার। দলমত ও ক্ষমতার পালাবদল হলেও যেন পুরোনো দমন-পীড়নের পুনরাবৃত্তি না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।”
তদন্তহীন চাকরিচ্যুতি ও বহিষ্কারের হিড়িক
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০টিরও বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতি, সাময়িক বরখাস্ত, পদাবনতি এবং পাঠদানে নিষেধাজ্ঞার মতো শাস্তি দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সহিংস কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা, দলের পক্ষে অন্য ‘ধ্বংসাত্মক’ কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া এবং ইসলামি পোশাক পরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করার অভিযোগে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগের সদস্য বা সমর্থক বলে অভিযোগ তুলে শত শত শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে, যা তাদের শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ শাস্তির মুখে পড়া এক ডজনের বেশি শিক্ষকের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিপত্র, সিসিটিভি ও বিভিন্ন ভিডিও পর্যালোচনা করেছে। আগস্ট ২০২৬-এর সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগপন্থী একটি টেলিগ্রাম গ্রুপের সদস্য হওয়ার অভিযোগে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৪০৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক অধ্যাপক হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেন, “আন্দোলনকে সমর্থন না করা আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষকদের মিথ্যা অভিযোগে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে; তাঁদের ক্লাস নিতে ও গবেষণার কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসের খণ্ডচিত্র
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রামাণিক তথ্যানুযায়ী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা নিচে তুলে ধরা হলো:
- যারা গ্রেপ্তারের ভয়ে ক্যাম্পাসে আসছেন না। সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে ঢাবির নতুন কর্তৃপক্ষ ৪৪ জন শিক্ষককে দায়িত্ব পালন বন্ধের নির্দেশ দেয়। আরও ২৫ জনের পাঠদানের দায়িত্ব সীমিত করা হয়। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য বিভাগীয় তদন্ত করা হয়নি। পরে একটি তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে ৬ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং ১৪ জনের বিরুদ্ধে একই ধরনের তদন্ত চলছে। এ ছাড়া ২০২৫ সালের মার্চে ১২৬ জন শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করে তাদের পরীক্ষার সনদ আটকে দেওয়া হয়েছে। মামলায় জড়ানো হয়েছে আরও ২৭৭ জন আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষার্থীকে,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়:
- তাঁরা ৪ আগস্ট আওয়ামী লীগের একটি মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। তবে ৪ আগস্টের মিছিলের ভিডিও পর্যালোচনা করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কোনো প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ বা নাশকতার প্রমাণ পায়নি। সাময়িক বরখাস্ত বা দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আরও ৩৪ জনের পদাবনতি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ, ময়মনসিংহের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ জন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত,বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি):
- তদন্তে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই দেওয়া হয়নি। এখানে ১২ জন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত ও ১০ জনকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আরও ৮৫ জন শিক্ষকের পদোন্নতি আটকে দেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগী শিক্ষকদের দাবি,শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়:
অধ্যাপক মশিউর রহমানের ঘটনার উল্লেখ
শাস্তির মুখে পড়া শিক্ষকদের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মশিউর রহমানের ঘটনাটি তুলে ধরেছে এইচআরডব্লিউ। ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তাঁকে সব ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, জুলাই ২০২৪-এ একটি টেলিভিশন আলোচনায় তিনি ছাত্র আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন এবং ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে অনুষ্ঠিত উপাচার্যদের বৈঠকে ‘গণহত্যায় উসকানি’ দিয়েছিলেন।
তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ওই অনুষ্ঠান ও সভার ভিডিও পর্যালোচনা করে এমন উসকানি বা আপত্তিকর বক্তব্যের কোনো প্রমাণ পায়নি। গত ৩১ আগস্ট ২০২৬-এ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করার সুপারিশ করলেও তিনি কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাননি বলে দাবি করেছেন এবং এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই দলীয় প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, অতীতের ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি না করে বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ, মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
গাজীপুর-সাভারে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, টিয়ার শেল নিক্ষেপ