গাজীপুরে ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর দাবিতে চলমান শ্রমিক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের সময় গুরুতর আহত পোশাকশ্রমিক তৌফিক শেখ (২১) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। গতকাল মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
এদিকে শ্রমিক অসন্তোষ, সংঘর্ষে মৃত্যুর ঘটনা এবং শিল্পাঞ্চলের সার্বিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে গতকাল রাতে গাজীপুরের অর্ধশতাধিক তৈরি পোশাক কারখানায় ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি এড়াতে কোনো কোনো কারখানায় এক দিনের, আবার কোনো কারখানায় দুই থেকে তিন দিনের এই জরুরি ছুটি দেওয়া হয়েছে।
নিহত তৌফিক শেখ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ছয়ঘড়িয়া গ্রামের তবিবুর রহমান তবি খানের ছেলে। তিনি গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে স্থানীয় ‘লায়লা গার্মেন্টস’-এ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।
ভিডিও করার সময় হামলা, চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু
তৌফিকের স্বজন ও সহকর্মীরা জানান, প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি বাংলাবাজার এলাকায় থেকে পোশাক কারখানায় কাজ করছিলেন। গত সোমবার (২ নভেম্বর) নোমান গ্রুপের টেরি টোয়েন্টি গার্মেন্টসের সামনে শ্রমিক আন্দোলন ও ভাঙচুর চলাকালে তৌফিক নিজের মুঠোফোনে সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ করার চেষ্টা করছিলেন। ওই সময় হামলাকারীরা চড়াও হয়ে তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং বেধড়ক মারধর করে। এতে তাঁর মাথায় ও শরীরে মারাত্মক জখম হয়। পরে সহকর্মীরা তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকার উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় গতকাল সকালে তাঁর মৃত্যু হয়।
তবে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন পুলিশের ওপর কোনো দোষ অস্বীকার করে বলেন, “একটি কারখানা জোরপূর্বক বন্ধ করার জন্য বহিরাগত কিছু লোক সেখানে গিয়ে চাপ সৃষ্টি করে। কারখানা কর্তৃপক্ষ বন্ধ করতে রাজি না হওয়ায় বহিরাগতদের সঙ্গে কারখানার শ্রমিকদের সংঘর্ষ বাধে। এতে এক শ্রমিক (তৌফিক) গুরুতর আহত হন এবং পরে মারা যান। ঘটনার সময় সেখানে পুলিশের কোনো সদস্য উপস্থিত ছিলেন না।”
গাজীপুরের অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি
শ্রমিক অসন্তোষ ও সার্বিক নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকার অর্ধশতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের জারি করা পৃথক নোটিশ থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
- কর্মক্ষেত্রে অস্থিতিশীলতা ও সার্বিক নিরাপত্তাঝুঁকির পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নির্ধারণ ও বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ, গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর এলাকার কটন ক্লাব (বিডি) লিমিটেড ও কটন ক্লাউড (বিডি) লিমিটেড যৌথভাবে সোম ও বৃহস্পতিবার (৪ ও ৫ নভেম্বর) দুই দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। তাদের নোটিশে বলা হয়েছে,কটন ক্লাব ও কটন ক্লাউড:
- কালিয়াকৈরের পূর্ব চন্দ্রা এলাকার লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড আজ বুধবার এক দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) থেকে তাদের কারখানা যথারীতি চালু হবে।লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি:
- ভোগড়া ও কাশিমপুর এলাকার এই তিনটি প্রতিষ্ঠান তিন দিনের টানা ছুটি ঘোষণা করেছে।প্যানোরোমা অ্যাপারেলস, মিতালী ক্লাব ও জকি গার্মেন্টস:
- কোনাবাড়ীর জরুন এলাকার স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপসহ মনটেক্স ও ডিবিএল গ্রুপ দুই দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে।স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ, মনটেক্স ও ডিবিএল:
এছাড়াও কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার এপেক্স হোল্ডিং লিমিটেড, ইকোটেক্স লিমিটেড, কোকোলা ফুড প্রোডাক্ট, সাদমা ফ্যাশন, হাইড্রোক্সাইড লিমিটেড ও ইন্টারস্টফসহ প্রায় অর্ধশতাধিক বড়-ছোট কারখানায় ছুটি দেওয়া হয়েছে।
‘পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার প্রত্যাশা’
ছুটি ঘোষণার পর পরিস্থিতি শান্ত হবে বলে আশা করছেন কারখানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কালিয়াকৈরের লিজ ফ্যাশন কারখানার মানবসম্পদ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “শ্রমিক অসন্তোষের কারণে কারখানা দুই দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এরপর শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় শ্রমিকেরা টানা তিন দিন ছুটি পাবেন। আমরা আশা করছি, এই দীর্ঘ ছুটির মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও শান্ত হয়ে আসবে।”
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসেন বলেন, “উত্তেজনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে বেশ কয়েকটি কারখানা কর্তৃপক্ষের ছুটি বা বন্ধের খবর আমরা পেয়েছি। তবে বিজিএমইএ কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ না রাখার আহ্বান জানিয়েছিল। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা রোধে শিল্পাঞ্চলে অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।”
গাজীপুর-সাভারে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, টিয়ার শেল নিক্ষেপ