আওয়ামী লীগ শাসনামলের গত ১৫ বছরে বিরোধী মতের রাজনীতি দমন ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত আক্রোশ ও জেদের বহিঃপ্রকাশ। বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক অস্তিত্ব মুছে দিতে দেড় দশক ধরে রীতিমতো দমন-পীড়ন চালিয়েছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার। বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতারা দলগুলোর ওপর চলা নিপীড়নের ঘটনাকে এভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, সরকারবিরোধী মত দমন এবং পুরো সমাজব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে নিতে শেখ হাসিনার শাসনামলে পদ্ধতিগতভাবেই এই নিপীড়ন চালানো হয়েছিল।
খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড ও বিএনপির ওপর খড়্গ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যায়ের কর্মী-সমর্থকরাও নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা, গুম, হামলা-মামলা, গ্রেফতার ও কারাবন্দির শিকার হয়েছেন। ২০১৮ সালে তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানোর ঘটনাকে বিরোধী দলের ওপর নিপীড়নের অন্যতম বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।
বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে প্রায় ৭০০ মানুষকে গুম করা হয়েছে, যাদের মধ্যে চার শতাধিকই বিএনপির নেতাকর্মী। শুধু ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন বিএনপির দেড় হাজারের বেশি নেতাকর্মী। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিএনপির ৬০ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা হয়েছে। এমনকি একজন নেতার নামেই চার শতাধিক মামলা থাকার নজিরও রয়েছে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘হাসিনা ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থাকে এমনভাবে ধ্বংস করে দিয়ে গেছেন যে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মুখ দেখাদেখিও প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এর মূলে ছিল শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত কিছু আক্রোশ, জেদ ও কথাবার্তা। ফ্যাসিস্টদের মুখে এখনো শোনা যায়- ধরব, মারব, কাটব, আসছি, দেখিয়ে দেব। এগুলো তো রাজনীতির ভাষা নয়।’
জামায়াতের বক্তব্য: 'বিরোধী দলশূন্য করার অপচেষ্টা'ফ্যাসিবাদী শাসনামলে চরম নিপীড়নের শিকার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী আমলে কয়েক হাজার মানুষকে ক্রসফায়ারে ফেলা হয়েছে, গুম করা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অনেকে। এখানে সব দলের নেতারাই ছিলেন। এমন কোনো বিরোধী দল নেই, যাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন ও ক্র্যাকডাউন হয়নি। বিরোধী দলশূন্য করার জন্য যা করার, তিনি (শেখ হাসিনা) সব করেছেন।’
বিশ্লেষকদের মত: 'পদ্ধতিগত নিপীড়নে সংকুচিত রাজনীতি'বিশ্লেষকদের মতে, পুরো সমাজকে নিয়ন্ত্রণে নিতে শেখ হাসিনার শাসনামলে পদ্ধতিগত নিপীড়ন চালানো হয়েছে, যার ফলে স্বাভাবিক রাজনৈতিক চর্চা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতন্ত্র চর্চা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, ‘শেখ হাসিনার শাসনামলে পদ্ধতিগত নিপীড়নের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছিল, যাতে কোনো জায়গা থেকেই কেউ কোনো বক্তব্য দেয়ার সুযোগ না পান। পুরো সমাজকে নিয়ন্ত্রণে নেয়ার জন্য কাদের বিরুদ্ধে মামলা দিতে হবে, কাদের গুম বা হত্যা করতে হবে—এসব আগেই নির্ধারণ করা হতো।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাজনীতির একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু গত ১৭ বছরে আমরা দেখেছি, সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া চলমান ছিল না। বিরোধী দলের কোনো স্পেস ছিল না, বিরোধী বক্তব্যেরও কোনো সুযোগ ছিল না। সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসর খুবই সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল।’
তবে ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থান ও সম্মিলিত রাজনৈতিক বিজয়ের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেছে। বিশ্লেষকদের পরামর্শ, এই ঐক্য ধরে রেখেই ভবিষ্যতে দেশে সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন রাজনৈতিক নেতারাও।
মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন প্রধানমন্ত্রী