দেশজুড়ে মাদকের এক বিশাল নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন ২৫ হাজার ৫৫০ জনেরও বেশি চিহ্নিত শীর্ষ কারবারি। আর তাদের নেপথ্যে রয়েছেন এক হাজারের বেশি প্রভাবশালী গডফাদার। ইয়াবা, হেরোইন, আইস, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ মাদকের আমদানি, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণ চলছে মূলত এই চক্রের নিয়ন্ত্রণে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) সর্বশেষ অনুসন্ধান ও হালনাগাদ তালিকায় ভয়াবহ এ চিত্র উঠে এসেছে।
শীর্ষ গডফাদার ও ডিএনসির তালিকাডিএনসি সূত্র জানায়, গত জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে সংস্থাটির বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালিয়ে এই তালিকা প্রস্তুত করেন। তালিকায় কক্সবাজার ও টেকনাফ এলাকায় সক্রিয় কারবারিদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তালিকাভুক্ত গডফাদারদের মধ্যে অন্যতম নবী হোসেন। আরাকানকেন্দ্রিক তার মাদক সাম্রাজ্যের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকার কয়েক শ সহযোগী যুক্ত। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আলোচিত মাদক কারবারি দিলদার ও পিচ্চি রাজা তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এছাড়া আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গেও নবী হোসেনের যোগাযোগ রয়েছে। ডিএনসির উপপরিচালক মুকুল জ্যোতি চাকমা জানান, চিহ্নিত কারবারিদের আইনের আওতায় আনতে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে এবং ইতিমধ্যে তালিকার অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মাদক পাচারের রুট ও সীমান্ত পরিস্থিতিসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কড়া নজরদারি সত্ত্বেও বাংলাদেশকে ইয়াবা, হেরোইন, কুশ ও কোকেন পরিবহনের আন্তর্জাতিক করিডর হিসেবে ব্যবহার করছে আন্তর্জাতিক চক্রগুলো। বিভিন্ন সীমান্তপথে প্রতিদিন বিপুল অর্থমূল্যের মাদকের চালান দেশে প্রবেশ করছে। বাজারে আসা ইয়াবার মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে, অবশিষ্ট অংশ অনায়াসেই ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে যায়।
এ পরিস্থিতিতে টেকনাফকে বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। মিয়ানমার সীমান্তসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ডিএনসি, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তথ্য বিনিময় এবং যৌথ অভিযান পরিচালনা করছে।
সামাজিক প্রভাব ও বারগুলোতে বিতর্কিত অভিযানমাদকের ভয়াল থাবা এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশাজীবীর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। নেশার অর্থ জোগাতে গিয়ে অনেকেই ছিনতাই ও হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে জড়াচ্ছে।
অন্যদিকে, রাজধানীর বিভিন্ন বার, ক্লাব ও তারকা হোটেলগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযান নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত ছয় মাসে এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪২টি অভিযান চালানো হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের ভাড়া দেওয়া বাড়িতে পরিচালিত এক অভিযানে চার বোতল মদ, একটি ইয়াবা ও সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধারের পর ৮৪ জনকে আটক করা হয়, যাদের অধিকাংশই তরুণ। এ ঘটনায় পুলিশের অভিযান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক আসাদুজ্জামান খান শোভন জানান, দেশে থাকা ৫৮টি বারের বেশিরভাগ গ্রাহকেরই বৈধ লাইসেন্স রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বারে অভিযানের সময় ইউটিউবারদের উপস্থিতিতে বিষয়টি সামাজিকভাবে অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে, অথচ ইয়াবা উদ্ধারের মতো ভয়াবহ ঘটনাগুলো একই গুরুত্ব পাচ্ছে না। ডিএনসির উপপরিচালক রাজিউর রহমান অবশ্য বলেন, বারে অভিযান চালিয়ে মূলত লাইসেন্সের বৈধতা যাচাই করা হয়। কম বয়সী শিক্ষার্থীদের সেখানে পাওয়া গেলে অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
উদ্ধার পরিসংখ্যান ও বিশেষজ্ঞদের অভিমতডিএনসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৩ কোটি ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৩৩৩ পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। দৈনিক গড়ে জব্দের পরিমাণ ১ লাখ ৬৯ হাজারের বেশি, যা গত বছরের তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার বেশি। ডিএনসির মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ জানান, মাদক পাচার বন্ধ এবং সুস্থ সমাজ গড়তে সরকারের নীতিগত নির্দেশনা অনুসারেই কাজ করছে অধিদপ্তর।
তবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, অবৈধ এই বাণিজ্যের বড় চালানের বাহক ও খুচরা বিক্রেতারা গ্রেপ্তার হলেও এর পেছনের মূল অর্থদাতা, সরবরাহকারী ও সমন্বয়কারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।
সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে দীর্ঘ হচ্ছে শ্রমিক আন্দোলন শিল্পাঞ্চলে সহিংসতা ও ভাঙচুর ঠেকাতে নিরাপত্তা জোরদা