নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আগের তিন মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধের জন্য ব্যাংক খাত থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে যাচ্ছে সরকার। এ উদ্দেশ্যে ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম আয়োজন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ১ নভেম্বর অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী বকেয়া অর্থও পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে।
বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের সাময়িক অর্থসংকট মোকাবিলায় সাধারণত ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল ইস্যু করা হয়। তবে রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের মধ্যে সাময়িক ব্যবধান তৈরি হলে স্বল্পমেয়াদি অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিল ছাড়ে সরকার। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের বিল ইস্যুর প্রয়োজন দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অক্টোবর মাসের ২৭ তারিখ পর্যন্ত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত নিলামে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হলে চলতি মাসে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এটি বর্তমান সরকারের এক মাসে নেওয়া সর্বোচ্চ ঋণ হবে।
এর আগে চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে ব্যাংক খাত থেকে ৫৬ হাজার কোটি টাকা, আগস্টে ৫০ হাজার কোটি টাকা এবং সেপ্টেম্বরে প্রায় ৪১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল সরকার। তবে এসব অর্থের একটি বড় অংশ আগের ঋণের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা পরিশোধ কিংবা নতুন ঋণের মাধ্যমে পুনঃঅর্থায়নে ব্যবহার করা হয়। সে কারণে মোট ঋণ সংগ্রহের পরিমাণ এবং প্রকৃত বা নিট ঋণের হিসাব এক নয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া হয়েছে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা।
সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ার প্রভাব পড়েছে ট্রেজারি বিলের সুদহারেও। ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড গত ৫ অক্টোবর ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ থাকলেও ২৬ অক্টোবর তা বেড়ে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে, গত আগস্টের শেষ দিকে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংক খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ থাকলেও সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যয়ের চাহিদা মেটাতে ঋণ গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়ায় সরকারকে ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে ঋণের চাপ কমানোর লক্ষ্যে চলতি অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকার সুকুক ইস্যুর পরিকল্পনা রয়েছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এর আগের অর্থবছরে এ খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।
সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর মতে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের জন্য বিশেষ ট্রেজারি বিল ইস্যু করা অর্থনীতি এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকে ইতিবাচক সংকেত নয়। রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে সরকারি ব্যয় বাড়ানো হলে ঋণের বোঝা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের কার্যক্রমও আরও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনও মনে করেন, রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী না হওয়ায় সরকারকে নিয়মিত ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। পাশাপাশি আগের ঋণের মেয়াদ পূর্ণ হলে তা পরিশোধের ক্ষেত্রেও নতুন ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে।
নতুন বেতনকাঠামো সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। ফলে এই অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সামাল দেওয়া এবং একই সঙ্গে ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো সরকারের জন্য বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। এ পরিস্থিতিতে রাজস্ব আয় বাড়ানো ও সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি বেতন দিতে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে সরকার