বেসামরিক চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশসহ ২৯টি দেশের নাগরিককে প্রতারণা ও জোরপূর্বক রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগের প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘের ইউক্রেনবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রকাশিত কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশিদের ভালো বেতনের চাকরির আশ্বাস দিয়ে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হতো। পরে তাঁদের রুশ ভাষায় লেখা সামরিক চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে।
কমিশন ৪৮টি দেশের নাগরিককে রুশ সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের বিষয়টি তদন্ত করে। এর মধ্যে ২৯টি দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রতারণার প্রমাণ পেয়েছে তারা। দেশগুলো হলো—আজারবাইজান, বাংলাদেশ, বেলারুশ, বলিভিয়া, ব্রাজিল, বতসোয়ানা, ক্যামেরুন, কলম্বিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক, এল সালভাদর, ঘানা, হন্ডুরাস, ভারত, জর্ডান, কেনিয়া, মরক্কো, নাইজেরিয়া, পেরু, ফিলিপাইন, দক্ষিণ আফ্রিকা, সোমালিয়া, শ্রীলঙ্কা, তাজিকিস্তান, তিউনিসিয়া, তুরস্ক, উগান্ডা, উজবেকিস্তান, ইয়েমেন ও জিম্বাবুয়ে। ভুক্তভোগীদের বয়স ছিল ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বিভিন্ন দেশের মধ্যস্থতাকারী ও এজেন্টরা যুক্ত ছিলেন। তাঁরা নিজেদের বৈধ নিয়োগদাতা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে বিদেশে ভালো বেতনের চাকরির প্রস্তাব দিতেন। কাউকে নিরাপত্তাকর্মী, গাড়িচালক, নির্মাণশ্রমিক, মেকানিক, ইলেকট্রিশিয়ান, পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা রাঁধুনির কাজের কথা বলা হতো। অন্যদের তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা ও কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে চাকরির আশ্বাস দেওয়া হতো।
চাকরিপ্রার্থীদের আকৃষ্ট করতে উচ্চ বেতন, থাকা-খাওয়ার সুবিধা, রুশ নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে লিখিতভাবে জানানো হয়েছিল, এসব চাকরির সঙ্গে সামরিক বাহিনী বা ইউক্রেনের যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই।
কমিশনের মতে, বিভিন্ন দেশে নিয়োগের ধরন, চাকরির প্রতিশ্রুতি ও ভ্রমণের ব্যবস্থা একই রকম হওয়ায় ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন বলা যায় না। বরং এর পেছনে সমন্বিত নিয়োগব্যবস্থার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, এজেন্টরা ভিসা, বিমানের টিকিট ও যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দিতেন। রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেককে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সামরিক চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করা হতো।
চুক্তিগুলো রুশ ভাষায় লেখা থাকায় অধিকাংশ বিদেশি নাগরিক এর শর্ত বুঝতে পারেননি। অনেকে বুঝতেই পারেননি, বেসামরিক চাকরির পরিবর্তে তাঁদের সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চুক্তিতে সই করার পর কয়েকজনের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাঁদের চলাফেরায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। সামরিক দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানালে মারধর, কারাবাস ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে কয়েকজন ভুক্তভোগী সাক্ষ্য দিয়েছেন।
রাশিয়ায় আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন, এমন কিছু বিদেশি নাগরিককেও চাপ দিয়ে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন। তাঁদের মধ্যে আটক ব্যক্তি, অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতায় পড়া মানুষ এবং কারাগারে থাকা ব্যক্তিরাও ছিলেন।
সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে নিয়োগপ্রাপ্তদের ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। তাঁদের অনেককে বিপজ্জনক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের কেউ নিহত হয়েছেন, কেউ নিখোঁজ হয়েছেন, আবার কেউ ইউক্রেনীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন কিংবা বন্দি হয়েছেন।
কমিশন এসব নিয়োগপ্রক্রিয়াকে মানবপাচার ও মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেছে।
এদিকে গত ১৪ অক্টোবর স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) জানিয়েছিল, নির্মাণশ্রমিকের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অন্তত ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানোর পর তাঁদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে তাঁদের মধ্যে অন্তত ২০ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। নিহতদের ১৭ জন যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েনের প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় প্রাণ হারান বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ মে তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওই বাংলাদেশিরা রাশিয়ায় যান। প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে রুশ সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করা হয়। মাত্র ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
এ ঘটনায় মানবপাচার চক্রের সন্দেহভাজন দুই সদস্য মিজানুর রহমান ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চক্রটির সঙ্গে রাশিয়ার এক নাগরিক ও কিরগিজস্তানের এক নারীর সংশ্লিষ্টতার তথ্যও পেয়েছে এসআরবি।
সংস্থাটির তদন্ত অনুযায়ী, বাকি বাংলাদেশিদের মধ্যে দুজন আহত অবস্থায় দেশে ফিরেছেন, দুজন মস্কোর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন।
বিদেশে চাকরির প্রলোভনে অর্থ লেনদেনের আগে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছে এসআরবি।
সূত্র: ওএইচসিএইচআর, দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট।
ক্রসফায়ার চায় না সরকার, আইজিপির বক্তব্য ঠিক হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী