ইরানকে অত্যাধুনিক এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের বিষয়ে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চলছে। দীর্ঘদিন ধরে চেয়ে আসা এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শেষ পর্যন্ত সরবরাহ করবেন বলে আশাবাদী তেহরান। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এস-৪০০ পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী ইরানের কর্মকর্তারা। এ লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজাইকে একটি গোপন চিঠিসহ মস্কোতে পাঠান। চিঠিতে মূলত রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়।
ইরানের এই উদ্যোগ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, রাশিয়া ইরানকে কোনো ধরনের সহায়তা করছে না।
মস্কো সফর শেষে মোহসেন রেজাই জানান, পুতিনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বিষয়, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়া থেকে ইরানে নতুন গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে তৎপর তেহরান
সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে ইরানের বেশ কয়েকটি চুক্তি হয়েছে বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত মোকাবিলা এবং দেশটির ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কৌশলের অংশ হিসেবে এসব চুক্তি করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দ্য টেলিগ্রাফের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইরানি কর্মকর্তাদের কাছে বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছিল। এর মধ্যে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বিশেষ করে সামরিক ক্ষেত্রে কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রস্তাব ছিল।
ফাঁস হওয়া একটি গোপন নথিতে দেখা গেছে, ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা চীন ও রাশিয়ার মতো বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছিলেন। এর মাধ্যমে মার্কিন চাপ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে চায় তেহরান।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর আগে ইরানের পার্লামেন্টের একটি গোপন কমিটি এসব সুপারিশ তৈরি করে। এতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কেন এস-৪০০ প্রয়োজন ইরানের?
ইরানের প্রতিরক্ষা নীতির জন্য এস-৪০০ সংগ্রহের উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে নিজেদের আকাশসীমা, পারমাণবিক স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইরানের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া বহু বছর ধরেই ইরানের কাছে এ ধরনের অত্যাধুনিক অস্ত্র বিক্রির সম্ভাবনা দেখিয়ে আসছে। তবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির আশঙ্কায় মস্কো শেষ পর্যন্ত সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেয়নি।
এবারও এস-৪০০ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ, ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগার, বিমানঘাঁটি এবং বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা নিয়মিত আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ইরানের চাহিদা থাকলেও পর্যাপ্ত এস-৪০০ সরবরাহের সক্ষমতা রাশিয়ার নাও থাকতে পারে।
ইরানের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির তথ্য ফাঁস
এদিকে বৃহস্পতিবার ফাঁস হওয়া রাশিয়ার প্রতিরক্ষা প্রকল্পের কয়েকটি নথিতে ইরানের জন্য হেলিকপ্টার থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির তথ্য উঠে এসেছে।
নথি অনুযায়ী, রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো ইরানের জন্য বিশেষায়িত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সরঞ্জাম তৈরি করছে। এসব নথিতে ইরানকে ‘কে-১০’ সাংকেতিক নামে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরঞ্জামগুলোর মধ্যে রয়েছে এলএমইউআর বা প্রোডাক্ট-৩০৫ নামের নির্ভুল লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ব্যবস্থা। ২০২৪ সালের একটি সরবরাহ সূচি অনুযায়ী, দুটি করে রেলযুক্ত ৯০টি উৎক্ষেপণযন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহের ইউনিট তৈরি করে ইরানে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এসব সরঞ্জাম সরবরাহের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
রাশিয়া-চীনকে কৌশলগত অংশীদার করতে চায় ইরান
ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে সরাসরি আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিয়ে ট্রাম্প রাশিয়া-ইরান সম্পর্কের গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।
গত ১২ অক্টোবর রাশিয়া ও চীনের সহায়তার বিষয়ে সতর্কবার্তা নাকচ করে ট্রাম্প বলেন, তাদের সহায়তার মাত্রা খুবই কম। এমনকি তারা আদৌ ইরানকে সহায়তা করছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি।
তবে গত ২১ অক্টোবর মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠকে পুতিন বলেন, সংকট সমাধানে কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকলে রাশিয়া সহায়তা করতে আগ্রহী।
দ্য টেলিগ্রাফের পর্যালোচনা করা ইরানের যুদ্ধ পরিকল্পনাসংক্রান্ত একটি স্মারকলিপিতে বড় ধরনের সংঘাত মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মিত্রদের কাজে লাগানোর কৌশল তুলে ধরা হয়েছে।
নথিতে বলা হয়েছে, গত চার দশকে বিদেশি চাপের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণের প্রতিরোধ প্রমাণ করেছে, ভেতর থেকে দেশটির পতন ঘটানোর কৌশল সহজে সফল করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনুসরণ করতে অস্বীকৃতি জানানো চীন ও রাশিয়ার মতো নতুন বৈশ্বিক শক্তির উত্থান ইরানের কৌশলগত তৎপরতার সুযোগ বাড়িয়েছে।
মার্কিন কৌশল মোকাবিলায় স্মারকলিপিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিরোধমূলক অর্থনীতি শক্তিশালী করা, তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদার করা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়ানো।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নীতির অসংগতিগুলো তুলে ধরতে জনকূটনীতি ও গণমাধ্যমকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরেছে নথি
স্মারকলিপিতে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্বের বিষয়টিও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্বের মোট তেল মজুতের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং গ্যাস মজুতের ৪০ শতাংশ এ অঞ্চলে রয়েছে।
এ ছাড়া বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি নৌপথ—হরমুজ প্রণালি, বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও সুয়েজ খাল মধ্যপ্রাচ্য ও এর আশপাশে অবস্থিত। সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল এবং কনটেইনার পণ্যের বড় একটি অংশ এসব নৌপথ দিয়ে চলাচল করে।
নথিতে বলা হয়েছে, এসব গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের অন্তত দুটি বর্তমানে হুমকির মুখে বলে মনে করছে ওয়াশিংটন। ফলে পশ্চিমাদের কাছে পশ্চিম এশিয়ার কৌশলগত গুরুত্ব এখনো অত্যন্ত বেশি।
এতে আরও সতর্ক করা হয়েছে, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে যেকোনো পরিবর্তন সরাসরি জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদনে জোর
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব নিয়েও স্মারকলিপিতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা খাতের জন্য ক্ষতিকর হলেও কিছু ক্ষেত্রে তা দেশটির নিজস্ব প্রযুক্তি উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করেছে।
নিষেধাজ্ঞার কারণে যুদ্ধবিমান ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সংগ্রহেও বাধার মুখে পড়েছে তেহরান। তবে এসব সীমাবদ্ধতা দেশটিকে নিজস্ব প্রযুক্তিতে অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরিতে উৎসাহিত করেছে।
এর উদাহরণ হিসেবে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি বাভার-৩৭৩ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং শাহেদ-১৩৬ ও আবাবিল ড্রোনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা ইরানকে থামাতে পারেনি; বরং দেশটিকে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথে আরও এগিয়ে দিয়েছে।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ
সীমান্তের ওপার থেকেও ষড়যন্ত্র হচ্ছে দেশের বিরুদ্ধে: তারেক রহমান